This is default featured post 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured post 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured post 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured post 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured post 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

Showing posts with label হত্যা. Show all posts
Showing posts with label হত্যা. Show all posts

Saturday, 9 May 2015

রুবেল হত্যায় ডিবির নিষ্ঠুরতা ও এসি আকরামের আসল চেহারা ফাঁস

চাঞ্চল্যকর সেসব খুন (২)
রুবেল হত্যায় ডিবির নিষ্ঠুরতা ও এসি আকরামের আসল চেহারা ফাঁস
মির্জা মেহেদী তমাল



বড় ধরনের খুনের ঘটনায় দেশজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। চলে আলোচনা-পুলিশ-আসামি-ফাঁসি। এরপর শুধুই স্মৃতি। ধূসর-বিবর্ণ। অতঃপর বিস্মৃতি। ঘটনা আর মনেও থাকে না। চায়ের কাপের সেই ঝড় থামে, তবে দু-একটি অশ্রুভেজা চোখ তখনো জেগে থাকে। ধারাবাহিক প্রতিবেদনে পড়ুন সেসব ঝড়-রক্ত-শকুন আর কাপালিক ছুরি।


৩৬ মিন্টো রোড। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দফতর। হাজতখানার বাইরে ৪-৫ জন পুলিশ মিলে বেধড়ক পেটাচ্ছেন এক যুবককে। কেউ লাঠি দিয়ে, কেউ শটগান দিয়ে। কেউ আবার লাথি, কিল-ঘুষি। যে যেভাবে পারছে, মারতে মারতে পুলিশ সদস্যরাই হাঁপিয়ে উঠছিলেন। যুবকটির গগনবিদারী চিৎকারে ডিবি অফিসে তখন এক ভীতিকর পরিস্থিতি। হাজতখানায় আটক দাগি আসামিরাও পুলিশের এমন উন্মত্ত আচরণে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন। কেউ কেউ কাঁদছিলেনও। হতভাগ্য ওই যুবকটিকে একপর্যায়ে মেঝের ওপর ফেলে পুলিশের দুই সদস্য হাত ও পা চেপে ধরেন। অপর একজন যুবকটির বুকের ওপর উঠে লাফাচ্ছিলেন। জবান বন্ধ হওয়ার অবস্থা যুবকটির। শুধু গোঙানির শব্দ। ওই অবস্থায় তাকে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া হয় ডিবি অফিসের মূল ভবনের পেছনের পানির হাউসের সামনে।
সেখানে চলে তার ওপর পানিথেরাপি। গামছা দিয়ে নাকমুখে বেঁধে পানি ঢালা হয় অনবরত। নিস্তেজ হয়ে পড়ে যুবকটি। নাক দিয়ে গল গল করে রক্ত বেরোতে থাকে। তাতেও ভ্রুক্ষেপ নেই পুলিশ সদস্যদের। কিছু সময় এভাবে চলার পর হঠাৎ সাড়াশব্দ বন্ধ। নড়াচড়া নেই। নেই শ্বাস-প্রশ্বাসও। বন্ধ হয়ে যায় যুবকের দেহঘড়ি। আজ থেকে ১৭ বছর আগে ডিবি অফিসের ভিতর এমন নানা নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারান ২৩ বছরের যুবক শামীম রেজা রুবেল। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির মেধাবী ছাত্র তরতাজা যুবক রুবেলকে বাসার সামনে থেকে পেটাতে পেটাতে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর মাত্র ৫ ঘণ্টা বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত রুবেলকে সইতে হয়েছিল নানা কায়দার নিষ্ঠুর নির্যাতন। ডিবি অফিসে এই নির্যাতনের আগে রুবেলকে মারধর করা হয় মৌচাকের বাসার সামনেই। বাঁচাও, বাঁচাও আর্তচিৎকার শুনে রুবেলের বৃদ্ধ মা, ভাবী রাস্তায় ছুটে আসেন। মা, ভাবী পুলিশের পা জাপটে ধরেন। পুলিশের ওই সদস্যরা হেঁচকা ধাক্কায় ফেলে দেন তাদের।১৯৯৮ সালে রুবেল হত্যার এই ঘটনাটি দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার পরদিন পত্র-পত্রিকায় ঘটনাটি প্রকাশ হওয়ার পর স্তম্ভিত গোটা দেশ। ক্ষুব্ধ মানুষ নেমে আসে রাজপথে। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তারা। অপরাধী পুলিশ সদস্যদের গ্রেফতারের দাবিতে সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। রুবেল খুনের প্রেক্ষাপটে পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড রোধে এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।পুলিশ তাদের নির্যাতনে রুবেল হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার শত চেষ্টা করেও তখন তা পারেনি। রুবেলকে শীর্ষ সন্ত্রাসী বানিয়ে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। কারণ তার বিরুদ্ধে দেশের কোনো থানাতেই একটি জিডিও পাওয়া যায়নি। উপরন্তু দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে যিনি হয়েছিলেন সারা দেশের মানুষের চোখের মণি, সেই এসি আকরামের প্রকৃত চেহারা বেরিয়ে আসে এই হত্যার মধ্য দিয়ে। তৎকালীন ডিবির ভালো চেহারার পেছনে যে এক ভয়ঙ্কর রূপ ছিল, মারা গিয়ে তা জানান দিয়ে গেছেন হতভাগ্য রুবেল। তার মৃত্যুর পর বেরিয়ে আসে ডিবির ভয়ঙ্কর সব ঘটনার তথ্য। পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একে একে গ্রেফতার করে সেই সময়ে আলোচিত ও পুলিশ বিভাগে প্রবল ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিলেন এসি আকরাম। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! যিনি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আটক করে জেলে পুরেছিলেন, সেই তাদের সঙ্গেই জেলে থাকতে হয়েছে এসি আকরামকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওই সময়ে ডিবি পুলিশের নানা অপকীর্তি ফাঁস হতে থাকে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে আলোচিত হওয়া এসি আকরাম ও তার টিমের সদস্যরা কীভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে জোর করে টাকা আদায় করছে, সেসব ঘটনাগুলো এই সময়ে ফাঁস হয়। দেশের মানুষের কাছে নায়ক হয়ে ওঠা এসি আকরাম মুহূর্তেই খলনায়কে পরিণত হন। ভুক্তভোগী অনেকেই এ সময় অভিযোগ করে বলেছেন, এসি আকরামের সঙ্গে দেখা করতে হলেই মোটা অঙ্কের ভিজিট দিতে হতো। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের নাম ভাঙিয়ে এসি আকরামসহ তার দলের সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে ওঠার নানা ঘটনাও ফাঁস হয়। ডিবি পুলিশ সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে ওঠে মূর্তিমান আতঙ্ক। এই হত্যাকাণ্ডটি ডিবি পুলিশের অতীতের সব অর্জন ধূলিসাৎ করে দেয়। যা পুনরুদ্ধারে বহু বছর অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে পুলিশের এই সংস্থাকে। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল রাজধানীর সার্কুলার রোড এলাকার বাসার সামনে থেকে ধরে নিয়ে রুবেলকে অমানুষিক নির্যাতন করে। ধরে নেওয়ার পর অস্ত্র উদ্ধারের নামে রুবেলকে তার বাসার কাছে নিয়েও প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। রুবেলের পরিবারের সদস্যরা এ সময় রাস্তায় পুলিশের পা জড়িয়ে ধরে রুবেলের প্রাণ ভিক্ষা চান। পুলিশের মন গলেনি তাতেও। তারা রুবেলকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় আবারও গোয়েন্দা দফতরে। অমানুষিক নির্যাতন করা হয় রুবেলকে। নির্যাতনে রুবেলের মৃত্যু হলে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেন ডিবির কয়েক কর্মকর্তা। ওই সময় ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আকরামের নির্দেশে রুবেলকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করা হয়। নির্যাতন চালান ডিবির উপ-পরিদর্শক হায়াতুল ইসলাম ঠাকুরসহ কয়েকজন। ওই হত্যাকাণ্ডে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে মামলা হয় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হন এসি আকরামসহ ১৩ ডিবি পুলিশ। ওই হত্যা মামলায় ৯ জন গ্রেফতার হন। মামলার তদন্তের দায়িত্ব বর্তায় পুলিশেরই অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। তদন্তে বেরিয়ে আসে রুবেলের প্রতিবেশী রোকসানা বেগম ওরফে মুকুলী বেগমের ইন্ধনেই রুবেলকে আটক করে নির্যাতন করা হয়। প্রায় চার বছর বিচারকাজ চলার পর ২০০২ সালের ১৭ জুন ঢাকার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত এসি আকরামসহ ডিবির ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। মুকুলী বেগমকে দেওয়া হয় এক বছরের কারাদণ্ড। আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করেন। এরপর গত বছর ৫ মে এক রায়ে এসি আকরামসহ ১৩ আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে শুধু ডিবির উপ-পরিদর্শক হায়াতুল ইসলাম ঠাকুরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ বহাল রাখা হয়। ওই রায়ের পর কারাগারে বন্দী এসি আকরাম ছাড়া পান। চাঞ্চল্যকর ওই হত্যা মামলার রায়ে হতাশ রুবেলের পরিবার। স্বজনরা বলছেন, মামলার অভিযোগপত্রে এবং আসামিদের জবানবন্দিতে ডিবির সদস্যরা অভিযুক্ত বলে প্রমাণিত হয়। এরপরও মহামান্য আদালতের রায়ে আসামিরা কীভাবে বেকসুর খালাস পেয়েছেন, তা বুঝতে পারছেন না তারা। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বর্তমানে মিরপুরের বাসায় প্রতিবেশী, স্বজনদের সঙ্গে দেখা করে সময় কাটে এসি আকরামের। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, রেখেছেন দাড়িও। নিজের চার তলা বাড়ির নাম হোসাইন ভিলা। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পেশাগত প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন তিনি।হত্যা মামলা যেভাবে : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার দিন রাতেই রুবেল নিহত হওয়ার পর ডিবি পুলিশ রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করে। উপ-পরিদর্শক হায়াতুল ইসলাম ঠাকুর ওই মামলার (নম্বর ৫০/৯৮) বাদী হন। ডিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, রুবেল সন্ত্রাসী এবং তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা আছে। অবশ্য পরে একটি মামলাও প্রমাণ করতে পারেননি তারা। পরদিন সকালেই রুবেলের বাবা আবদুর রব রমনা থানায় অভিযোগ করেন। ওইদিন ঘটনাটি দেশব্যাপী জানাজানি হলে রুবেলের বাবার অভিযোগ গ্রহণ করে পুলিশ। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান। সিআইডির তদন্তে এসি আকরাম, মুকুলী বেগমসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসে।ময়নাতদন্তে যা আসে : ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেও প্রমাণিত হয়, রুবেলকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রুবেলের কপালের বাঁ পাশে চোখের ওপর অনুমান দেড় ইঞ্চি লম্বা কালো দাগ, ডান হাতের বাহুর ওপর কালো দাগ এবং বগলের নিচে একই রকম দাগ। বাঁ পায়ের তালুতেও কালো দাগ দেখা গেছে। দুই হাতের আঙ্গুলগুলো ফোলা, বাঁ পায়ের পেছনে কালো দাগ, পিঠের ডান পাশে কালো দাগ। তার নাক দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল।

Friday, 8 May 2015

এখনো কাঁদে নিদারাবাদ

চাঞ্চল্যকর সেসব খুন (১)
এখনো কাঁদে নিদারাবাদ
মির্জা মেহেদী তমাল



বড় ধরনের খুনের ঘটনায় দেশজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। চলে আলোচনা-পুলিশ-আসামি-ফাঁসি। এরপর শুধুই স্মৃতি। ধূসর-বির্বণ। অতঃপর বিস্মৃতি। ঘটনা আর মনেও থাকে না। চায়ের কাপের সেই ঝড় থামে, তবে দু'একটি অশ্রুভেজা চোখ তখনো জেগে থাকে। ধারাবাহিক প্রতিবেদনে পড়ুন সেসব ঝড়-রক্ত-শকুন আর কাপালিক ছুরি।


ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার (বর্তমান বিজয়নগর উপজেলা) নিদারাবাদ গ্রাম। গ্রামের প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে ধুপাজুড়ি বিল। নৌকায় করে সেই বিল দিয়ে প্রতিদিনই বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা ছিল ওই গ্রামের শিক্ষক আবুল মোবারকের। একদিন বিকালে স্কুল থেকে ফেরার পথে বিলের পানিতে দুর্গন্ধযুক্ত তেল ভাসতে দেখেন। তিনি নৌকার গতিপথটা একটু ঘুরিয়ে নেন। হঠাৎ নৌকার তলদেশে কী একটা আটকে যাওয়ায় ঢুলে ওঠে তার নৌকা! এবার মাঝির বৈঠায় খটখট শব্দ! সন্দেহ হয় শিক্ষক আবুল মোবারকের। তার নির্দেশমতো মাঝি বৈঠা দিয়ে পানির নিচে খোঁচাখুঁচি করতেই ভেসে ওঠে ড্রাম! তিনি ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খবর দিলেন। ড্রাম খুলতেই স্তব্ধ সবাই। তিন তিনটি লাশ! সন্ধান চলে আরও। মিলেও যায়। আরেকটি ড্রামে টুকরো টুকরো করে রাখা আরও তিনজনের লাশ! লাশ ছয়টি শনাক্ত হলো। এরা আর কেউ নন, একই গ্রামের নিরীহ শশাঙ্ক দেবনাথের স্ত্রী ও পাঁচ অবুঝ সন্তানের লাশ এগুলো। শশাঙ্কের স্ত্রী বিরজাবালা (৪৫), মেয়ে নিয়তি বালা (১৭), প্রণতি বালা (১০), ছেলে সুভাস দেবনাথ (১৪), সুপ্রসন্ন দেবনাথ সুমন (৫) ও দুই বছরের সুজন দেবনাথ। এই ঘটনাটি ১৯৮৯ সালের। এ ছয় লাশ উদ্ধারের দুবছর আগে অপহৃত হন শশাঙ্ক। তার আর খোঁজ মিলেনি। শশাঙ্কের এক মেয়ে সুনিতী শ্বশুরবাড়ি থাকায় তিনি বেঁচে যান প্রাণে। জানা গেছে, শশাঙ্কের সম্পত্তির ওপর লোভ ছিল পাশের গ্রামের কসাই তাজুল ইসলামের। এ কারণেই প্রথমে অপহরণ করে শশাঙ্ককে হত্যা করে সে। দুই বছর পর তার স্ত্রী-সন্তানসহ ছয়জনকে হত্যা করে ড্রামে চুন মিশিয়ে তাতে লাশ ভরে বিলে ফেলে দেওয়া হয়। সে সময় দুই বছরের শিশুকেও হত্যা করতে হাত কাঁপেনি খুনিদের। নৌকার সঙ্গে ড্রামের ছোট্ট একটি ধাক্কা খুলে দেয় রহস্যে ঘেরা নিদারাবাদ ট্র্যাজেডির আদ্যোপান্ত। অতঃপর খুনি ধরা পড়ে। খুনি কসাই তাজুলের প্রতি মানুষের ঘৃণা-ক্ষোভ এতটাই ছিল যে, তার ফাঁসি কার্যকরের পর ঘরে ঘরে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। তার লাশ কারাগার থেকে বের করার সময় ক্ষুব্ধ মানুষ থুথু দিয়েছে। ছুড়ে মেরেছে জুতা। ২৬ বছর আগেকার এ ঘটনাটি এখনো মানুষের মনে গভীর দাগ কেটে আছে। ছয় খুনের ঘটনা মনে করলেই এখনো আঁতকে ওঠে সেখানকার মানুষ। ঘটনাটি এতটাই আলোচিত হয়েছিল যে, এ নিয়ে পরবর্তীতে একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করা হয়। নাম ছিল কাঁদে নিদারাবাদ
ফ্লাশব্যাক : নিদারাবাদ ট্র্যাজেডি  ১৯৮৭ সালের ১৬ অক্টোবরের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে শশাঙ্ক দেবনাথকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় একই গ্রামের পূর্ব পরিচিত তাজুল ইসলাম। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে গুড় নিয়ে ফিরে আসার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন মুড়ির মোয়া বিক্রেতা শশাঙ্ক দেবনাথ। এরপর দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘুরে। ফিরে না শশাঙ্ক। তাজুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা করেন বিরজাবালা। মামলার রায় ঘোষণার দিন ঘনিয়ে আসতে থাকে। তাজুল আর তার সহযোগী বাদশাসহ সবার অপরাধই প্রমাণ হতে থাকে আদালতে। নিশ্চিত বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হয় তাজুল। শশাঙ্কের পরিবারের সবাইকে খুনের পরিকল্পনা আঁটে। ১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাত। ঘুমিয়ে নিদারাবাদ গ্রাম। শুধু জেগে আছে কসাই তাজুলের নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত। গভীর রাতে ৩০ থেকে ৪০ জনের ওই দুর্বৃত্তের দল হামলা চালায় শশাঙ্কের পরিবারের ওপর। জানালার লোহার রড ভেঙে ঘর ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। তারা অপহরণ করে নিয়ে যায় শশাঙ্কের স্ত্রী বিরজাবালাসহ ৫ সন্তানকে। বাঁচার জন্য তারা গগনবিদারী চিৎকার শুরু করেন। তাদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলেও সংঘবদ্ধ দলের সামনে দাঁড়াতে সাহস পায়নি। গ্রামবাসীর সামনে দিয়েই অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। বড় একটি নৌকায় তুলে নেয় তাদের। নৌকার ওপরই তাদের ছয়জনকে কুপিয়ে হত্যার পর টুকরা টুকরা করে। পরে ড্রামে ভরে ফেলে দেয় ধুপজুরি বিলে। অপহরণ ঘটনার ১০ দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর অপহৃত ছয়জনের লাশ মেলে। প্রতিটি লাশই ছিল কয়েক টুকরো। লাশে দ্রুত পচন ধরায় ঘাতকরা ড্রামের ভিতর চুন দিয়ে রাখে। বিল থেকে ছয়জনের লাশ উদ্ধারের পর এই খবর ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামে। হাজার হাজার মানুষ মর্মান্তিক সে ঘটনা জানতে ও লাশ দেখতে ঘটনাস্থলে ভিড় জমায়। আসে খুনের সঙ্গে জড়িতদের একজনও। সে হত্যাকাণ্ডের হোতা তাজুল ইসলামের বোনজামাই হাবিবুর রহমান। সে একা বড় একটি নৌকা নিয়ে লাশ দেখতে এলে এলাকাবাসী তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কথাবার্তায় সন্দেহ হলে তাকে পুলিশে দেওয়া হয়। তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আসামি করা হয় তাজুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, এনু মিয়া, ফিরোজ মিয়া, ফিরোজ মিয়া (২), হাবিব মিয়া, আবুল হোসেন, জজ মিয়া, বাদশা মিয়া, মো. কাজল, ফারুক মিয়া, আবুল কাশেমকে। এ ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন সদস্য (মেম্বার) মো. ধন মিয়া চৌধুরী বাদী হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানায় মামলা করেন। পুলিশ এ ঘটনায় ৩৮ জনকে দায়ী করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয়।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ছয় খুনের পরিকল্পনাটা দীর্ঘদিনের। পার্শ্ববর্তী পাঁচগাঁও গ্রামের তাজুল ইসলাম সম্পত্তি গ্রাস করতেই সম্পর্ক গড়ে তোলে শশাঙ্ক পরিবারের সঙ্গে। একপর্যায়ে শশাঙ্কের স্ত্রী বিরজাবালা তাজুল ইসলামকে ধর্মবাবা বলে ডাকতে শুরু করেন। এভাবে সম্পত্তির অনেক খুঁটিনাটি জেনে যায় তাজুল ইসলাম। ভুয়া দলিল তৈরি করে তাজুল সম্পত্তি আয়ত্তে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরিকল্পনা-মাফিক অপহরণের পর হত্যা করে শশাঙ্ককে। এক পর্যায়ে পুরো পরিবারটিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। ১৯৯০ সালের জুন মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জজ আদালত এক রায়ে ৯ জনের ফাঁসি, ২৭ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও দুজনকে বেকসুর খালাস দেন। পরে উচ্চ আদালত খুনি তাজুল ইসলাম, বাদশা মিয়ার ফাঁসি ও আটজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ বহাল রাখেন। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে আবুল হোসেন নামে একজন এখনো পলাতক। ১৯৯৩ সালের ১১ আগস্ট রাত ২টা ১ মিনিটে কুমিল্লা কারাগারে তাজুল আর বাদশার ফাঁসি কার্যকর হয়।
- See more at:

http://www.bd-pratidin.com/first-page/2015/05/08/79830#sthash.g5RFJZKr.dpuf

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites More