চাঞ্চল্যকর সেসব খুন (২)
রুবেল হত্যায় ডিবির নিষ্ঠুরতা ও এসি আকরামের
আসল চেহারা ফাঁস
মির্জা মেহেদী তমাল
|
বড় ধরনের খুনের ঘটনায়
দেশজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। চলে আলোচনা-পুলিশ-আসামি-ফাঁসি। এরপর শুধুই স্মৃতি।
ধূসর-বিবর্ণ। অতঃপর বিস্মৃতি। ঘটনা আর মনেও থাকে না। চায়ের কাপের সেই ঝড় থামে,
তবে দু-একটি অশ্রুভেজা চোখ তখনো জেগে থাকে। ধারাবাহিক প্রতিবেদনে পড়ুন সেসব
ঝড়-রক্ত-শকুন আর কাপালিক ছুরি।
|
৩৬ মিন্টো রোড। ঢাকা
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দফতর। হাজতখানার বাইরে ৪-৫ জন পুলিশ মিলে বেধড়ক
পেটাচ্ছেন এক যুবককে। কেউ লাঠি দিয়ে, কেউ শটগান দিয়ে। কেউ আবার লাথি, কিল-ঘুষি। যে
যেভাবে পারছে, মারতে মারতে পুলিশ সদস্যরাই হাঁপিয়ে উঠছিলেন। যুবকটির গগনবিদারী
চিৎকারে ডিবি অফিসে তখন এক ভীতিকর পরিস্থিতি। হাজতখানায় আটক দাগি আসামিরাও পুলিশের
এমন উন্মত্ত আচরণে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন। কেউ কেউ কাঁদছিলেনও। হতভাগ্য ওই যুবকটিকে
একপর্যায়ে মেঝের ওপর ফেলে পুলিশের দুই সদস্য হাত ও পা চেপে ধরেন। অপর একজন যুবকটির
বুকের ওপর উঠে লাফাচ্ছিলেন। জবান বন্ধ হওয়ার অবস্থা যুবকটির। শুধু গোঙানির শব্দ।
ওই অবস্থায় তাকে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া হয় ডিবি অফিসের মূল ভবনের পেছনের পানির হাউসের
সামনে।
সেখানে চলে তার ওপর
পানিথেরাপি। গামছা দিয়ে নাকমুখে বেঁধে পানি ঢালা হয় অনবরত। নিস্তেজ হয়ে পড়ে
যুবকটি। নাক দিয়ে গল গল করে রক্ত বেরোতে থাকে। তাতেও ভ্রুক্ষেপ নেই পুলিশ
সদস্যদের। কিছু সময় এভাবে চলার পর হঠাৎ সাড়াশব্দ বন্ধ। নড়াচড়া নেই। নেই
শ্বাস-প্রশ্বাসও। বন্ধ হয়ে যায় যুবকের দেহঘড়ি। আজ থেকে ১৭ বছর আগে ডিবি অফিসের
ভিতর এমন নানা নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারান ২৩ বছরের যুবক শামীম রেজা
রুবেল। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির মেধাবী ছাত্র তরতাজা যুবক রুবেলকে বাসার সামনে
থেকে পেটাতে পেটাতে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর মাত্র ৫ ঘণ্টা বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল।
মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত রুবেলকে সইতে হয়েছিল নানা কায়দার নিষ্ঠুর নির্যাতন।
ডিবি অফিসে এই নির্যাতনের আগে রুবেলকে মারধর করা হয় মৌচাকের বাসার সামনেই। বাঁচাও,
বাঁচাও আর্তচিৎকার শুনে রুবেলের বৃদ্ধ মা, ভাবী রাস্তায় ছুটে আসেন। মা, ভাবী
পুলিশের পা জাপটে ধরেন। পুলিশের ওই সদস্যরা হেঁচকা ধাক্কায় ফেলে দেন তাদের।১৯৯৮
সালে ‘রুবেল হত্যা’র এই ঘটনাটি দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি
করে। ঘটনার পরদিন পত্র-পত্রিকায় ঘটনাটি প্রকাশ হওয়ার পর স্তম্ভিত গোটা দেশ।
ক্ষুব্ধ মানুষ নেমে আসে রাজপথে। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তারা। অপরাধী পুলিশ সদস্যদের
গ্রেফতারের দাবিতে সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। রুবেল খুনের
প্রেক্ষাপটে পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড রোধে এক যুগান্তকারী রায়
দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।পুলিশ তাদের নির্যাতনে রুবেল হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার
শত চেষ্টা করেও তখন তা পারেনি। রুবেলকে শীর্ষ সন্ত্রাসী বানিয়ে নিজেদের রক্ষার
চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। কারণ তার বিরুদ্ধে দেশের কোনো থানাতেই একটি জিডিও পাওয়া
যায়নি। উপরন্তু দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে যিনি হয়েছিলেন সারা দেশের
মানুষের চোখের মণি, সেই এসি আকরামের প্রকৃত চেহারা বেরিয়ে আসে এই হত্যার মধ্য
দিয়ে। তৎকালীন ডিবির ভালো চেহারার পেছনে যে এক ভয়ঙ্কর রূপ ছিল, মারা গিয়ে তা জানান
দিয়ে গেছেন হতভাগ্য রুবেল। তার মৃত্যুর পর বেরিয়ে আসে ডিবির ভয়ঙ্কর সব ঘটনার তথ্য।
পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একে একে গ্রেফতার করে সেই সময়ে আলোচিত ও পুলিশ
বিভাগে প্রবল ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিলেন এসি আকরাম। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! যিনি শীর্ষ
সন্ত্রাসীদের আটক করে জেলে পুরেছিলেন, সেই তাদের সঙ্গেই জেলে থাকতে হয়েছে এসি
আকরামকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওই সময়ে ডিবি পুলিশের নানা অপকীর্তি ফাঁস হতে
থাকে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে আলোচিত হওয়া এসি আকরাম ও তার টিমের সদস্যরা
কীভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে জোর করে টাকা আদায় করছে, সেসব ঘটনাগুলো এই সময়ে ফাঁস
হয়। দেশের মানুষের কাছে নায়ক হয়ে ওঠা এসি আকরাম মুহূর্তেই খলনায়কে পরিণত হন।
ভুক্তভোগী অনেকেই এ সময় অভিযোগ করে বলেছেন, এসি আকরামের সঙ্গে দেখা করতে হলেই মোটা
অঙ্কের ভিজিট দিতে হতো। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের নাম ভাঙিয়ে এসি আকরামসহ তার
দলের সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে ওঠার নানা ঘটনাও ফাঁস হয়। ডিবি পুলিশ সাধারণ মানুষের কাছে
হয়ে ওঠে মূর্তিমান আতঙ্ক। এই হত্যাকাণ্ডটি ডিবি পুলিশের অতীতের সব অর্জন ধূলিসাৎ
করে দেয়। যা পুনরুদ্ধারে বহু বছর অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে পুলিশের এই সংস্থাকে।
গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল রাজধানীর সার্কুলার রোড এলাকার বাসার সামনে থেকে
ধরে নিয়ে রুবেলকে অমানুষিক নির্যাতন করে। ধরে নেওয়ার পর অস্ত্র উদ্ধারের নামে
রুবেলকে তার বাসার কাছে নিয়েও প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। রুবেলের পরিবারের সদস্যরা এ
সময় রাস্তায় পুলিশের পা জড়িয়ে ধরে রুবেলের প্রাণ ভিক্ষা চান। পুলিশের মন গলেনি
তাতেও। তারা রুবেলকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় আবারও গোয়েন্দা দফতরে। অমানুষিক
নির্যাতন করা হয় রুবেলকে। নির্যাতনে রুবেলের মৃত্যু হলে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে
প্রবাহিত করেন ডিবির কয়েক কর্মকর্তা। ওই সময় ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি)
আকরামের নির্দেশে রুবেলকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করা হয়। নির্যাতন চালান ডিবির
উপ-পরিদর্শক হায়াতুল ইসলাম ঠাকুরসহ কয়েকজন। ওই হত্যাকাণ্ডে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু
হলে মামলা হয় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত
থাকার অভিযোগে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হন এসি আকরামসহ ১৩ ডিবি পুলিশ। ওই হত্যা মামলায়
৯ জন গ্রেফতার হন। মামলার তদন্তের দায়িত্ব বর্তায় পুলিশেরই অপরাধ তদন্ত বিভাগে
(সিআইডি)। তদন্তে বেরিয়ে আসে রুবেলের প্রতিবেশী রোকসানা বেগম ওরফে মুকুলী বেগমের
ইন্ধনেই রুবেলকে আটক করে নির্যাতন করা হয়। প্রায় চার বছর বিচারকাজ চলার পর ২০০২
সালের ১৭ জুন ঢাকার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত এসি আকরামসহ ডিবির ১৩ জনকে যাবজ্জীবন
কারাদণ্ড দেন। মুকুলী বেগমকে দেওয়া হয় এক বছরের কারাদণ্ড। আসামিরা হাইকোর্টে আপিল
করেন। এরপর গত বছর ৫ মে এক রায়ে এসি আকরামসহ ১৩ আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।
রায়ে শুধু ডিবির উপ-পরিদর্শক হায়াতুল ইসলাম ঠাকুরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ বহাল
রাখা হয়। ওই রায়ের পর কারাগারে বন্দী এসি আকরাম ছাড়া পান। চাঞ্চল্যকর ওই হত্যা
মামলার রায়ে হতাশ রুবেলের পরিবার। স্বজনরা বলছেন, মামলার অভিযোগপত্রে এবং আসামিদের
জবানবন্দিতে ডিবির সদস্যরা অভিযুক্ত বলে প্রমাণিত হয়। এরপরও মহামান্য আদালতের রায়ে
আসামিরা কীভাবে বেকসুর খালাস পেয়েছেন, তা বুঝতে পারছেন না তারা। কারাগার থেকে
মুক্তি পাওয়ার পর বর্তমানে মিরপুরের বাসায় প্রতিবেশী, স্বজনদের সঙ্গে দেখা করে সময়
কাটে এসি আকরামের। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, রেখেছেন দাড়িও। নিজের চার তলা বাড়ির
নাম ‘হোসাইন ভিলা’। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পেশাগত
প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন তিনি।হত্যা মামলা যেভাবে : সংশ্লিষ্ট
সূত্র জানায়, ঘটনার দিন রাতেই রুবেল নিহত হওয়ার পর ডিবি পুলিশ রমনা থানায় একটি
অপমৃত্যু মামলা করে। উপ-পরিদর্শক হায়াতুল ইসলাম ঠাকুর ওই মামলার (নম্বর ৫০/৯৮)
বাদী হন। ডিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, রুবেল সন্ত্রাসী এবং তার বিরুদ্ধে অনেক
মামলা আছে। অবশ্য পরে একটি মামলাও প্রমাণ করতে পারেননি তারা। পরদিন সকালেই রুবেলের
বাবা আবদুর রব রমনা থানায় অভিযোগ করেন। ওইদিন ঘটনাটি দেশব্যাপী জানাজানি হলে
রুবেলের বাবার অভিযোগ গ্রহণ করে পুলিশ। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন সিআইডির সহকারী পুলিশ
সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান। সিআইডির তদন্তে এসি আকরাম, মুকুলী বেগমসহ কয়েকজনের
সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসে।ময়নাতদন্তে যা আসে : ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেও
প্রমাণিত হয়, রুবেলকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে
জখম পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘রুবেলের কপালের বাঁ পাশে চোখের ওপর অনুমান
দেড় ইঞ্চি লম্বা কালো দাগ, ডান হাতের বাহুর ওপর কালো দাগ এবং বগলের নিচে একই রকম
দাগ। বাঁ পায়ের তালুতেও কালো দাগ দেখা গেছে। দুই হাতের আঙ্গুলগুলো ফোলা, বাঁ পায়ের
পেছনে কালো দাগ, পিঠের ডান পাশে কালো দাগ। তার নাক দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল।’






